শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ০৯:২৪ পূর্বাহ্ন

কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় বন্দী ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের কয়েক লাখ মানুষ 

আবদুর রহিম
একদিকে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট কৃত্রিম জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানীতে চরম বিপাকে রয়েছে রাজধানীর শ্যামপুর,কদমতলী,ডেমড়া,নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের কয়েক লাখ মানুষ। জলাবদ্ধতা পাশাপাশি ডেঙ্গুরপ্রকোপ বেশী  থাকায় ডেঙ্গু আতঙ্কে রয়েছে এসব এলাকার বাসিন্দারা। বসত বাড়ীর চারপাশে পানি থাকায় অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। জলাবদ্ধতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার সম্ভাবনা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা জানায়, ভেরি বাঁধের ভেতরের এসব এলাকাগুলো সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে বৃষ্টির পানি বেরিয়ে যেতে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকায় বছরে বেশীরভাগ সময়ে এসব এলাকার কিছু কিছু জায়গায় জলাবদ্ধতা থাকে। সম্প্রতি সময়ে বৃষ্টির কারণে পুরো এলাকা জুড়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়ায় কয়েক লাখ মানুষ পানি বন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ডিএনডি অভ্যন্তরে অপরিকল্পিত নগরায়ন, বসতি স্থাপনের ফলে এ অঞ্চলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যায় রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের জঞ্জাল অল্প সময়ে দূর করা সম্ভব না। ফলে ভোগান্তি সহসাই শেষ হচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ফতুল্লার কুতুবপুরের দৌলতপুর, আদর্শনগর, মুন্সীবাগ এলাকার বসতবাড়ীতে পানি প্রবেশ করেছে। এসব এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পানি বন্দী জীবনযাপন করছে। বাড়ীর আঙ্গিনা, রান্না ঘর, টিউবওয়েল, বাথরুম পানির নিচে তলিয়ে আছে। এখানেই শেষ নয়, এসব এলাকার অনেক বাসিন্দা এই ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে নিজ বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। ভাড়াটিয়া শূন্য এসব এলাকার বসতবাড়িগুলো। কৃত্রিম জলাবদ্ধতার ফলে প্রভাব পরেছে এলাকার স্বাভাবিক কর্মকান্ডেও। দৌলতপুরে বাসিন্দা নুরুল ইসলাম জানায়, আমারা সারা বছরই পানি বন্দী থাকি। এলাকার চলাচলের রাস্তা পানির নিতে তলিয়ে থাকে। বসতবাড়ি এমনকি বসত ঘরেও পানি থাকে। পচা,দূর্গন্তময় পানির সাথে আমাদের সখ্য গড়ে উঠেছে।  এসব দেখার এখন আর কেউ নেই। ফলে বাধ্য হয়েই আমরা পানি বন্দী জীবনযাপন করছি। আদর্শনগরের বাসিন্দা মিজান জানায়, আমাদের এলাকা বছরের বেশীরভাগ সময়ই পানির নিচে তলিয়ে থাকে। সামান্য বৃষ্টিতে চলালচের রাস্ত, বসতবাড়ি কিংবা বসতঘরেও পানি উঠে যায়। এসব পানি পঁচে দূর্গন্ত সৃষ্টি হয়। ফলে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে পানি বন্দী মানুষ।
সূত্র জানায়, রাজধানীর শ্যামপুর, কদমতলী,ডেমড়া এলাকার নিম্নাঞ্চলগুলো কয়েকদিনের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। রাস্তার কোথায় কোমর সমান,কোথাও হাঁটু সমান পানির নিচে চলে গেছে। এছাড়া বসতবাড়ী, বসতঘরেও পানি প্রবেশ করেছে। শুধু রাজধানীর এসব এলাকাতেই নয়, পাশ্ববর্তী  নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের প্রায় কয়েক লক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। ইউনিয়নের শহীদ নগর, দৌলতপুর, মুন্সিবাগ, আদর্শ নগর, নূরবাগ, পিলকুনী, তক্কার মাঠ সহ আশপাশের প্রায় বেশ কয়েকটি গ্রামে টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে পানিতে। ঘরবন্দী জীবন যাপন করে এসব এলাকার বাসিন্দারা। কুতুবপুর ইউনিয়ন সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট। ড্রেন ব্যবস্থা না থাকার কারণে অল্প সময়ে তলিয়ে যায় অধিকাংশ রাস্তাঘাট।
নয়ামাটি থেকে পাগলা যাওয়ার প্রধান সড়কটির নয়ামাটি এবং পাগলা স্কুল কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে প্রায় হাঁটু সমান প্রাণী জমে রয়েছে।  আর এতে  চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, প্রতিদিনের চলাচলের প্রধান সড়ক একটু বৃষ্টি হলেই এমন অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় এই রাস্তায় যাতায়াতরত স্কুল কলেজে শিক্ষার্থী এবং  কর্মজীবী মানুষদের।
অন্যদিকে ফতুল্লা পোষাকুকুর পাড়,গাবতলী তাগারপার,আজমেরীবাগ,সস্তাপুর,লালখা এলাকা জুড়ে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ডোবা,নালা ভরাট হওয়ায় বৃষ্টির পানি সহজে বের হতে পারছে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় এসব এলাকা।বসতবাড়ীতেও পানি থাকে বছর জুড়ে। একই অবস্থা বিরাজ করছে সিদ্ধিরগঞ্জের অনেক এলাকায়। নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে ময়লা পানিতে। মিজমিজি এলাকায় গিয়ে মানুষের বসতবাড়ীতে পানি দেখাগেছে। ময়লা পানিকে সঙ্গী করেই এই এলাকার মানুষের বসবাস। গত ক’দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে কেউ কেউ আত্মীয় স্বজনদের বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, জলাবদ্ধতার কারণে কোরবানীর ঈদের দিন অনেকে পশু কোরবানী দিতে পারেনি অনেকে। টিউবওয়েল, রান্নাঘর পানির নিচে থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
কয়েক মাস পূর্ব ডিএনডি এলাকার জলাবদ্ধতার খবরে এলাকাবাসীর কাছে ছুটে এসেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান। বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যম জানিয়েছেন, পানিটা সাদা হলে ব্যাপার ছিল না। এটা পানি না, এটা হচ্ছে একটা বিষাক্ত পদার্থ। এই পানির সাথে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ময়লা থেকে আরম্ভ করে এমন কোন বিষ প্রক্রিয়া নাই এই পানির সাথে না আছে। আমার এলাকার ৩০ থেকে ৪০ লাখ লোক এই পানির ভিতরে থাকে এবং তারা পানি বন্দি অবস্থায় আছেন।  এই পানি যদি কমপ্লিটলি অপসারণ না করা যায় এবং করা না হয় তাহলে আমার একটাই পথ থাকবে আমি তো আর কোন প্রতিবাদ করতে পারবোনা। আমি এলাকার মানুষকে সাথে নিয়ে ওই ময়লা পানির বর্জ্যের মধ্যে নেমে অবস্থান ধর্মঘট করবো যতক্ষণ পর্যন্ত এটা সমস্যার সমাধান না হবে।  সেনাবাহিনীর ভাইরাও তখন আমাকে ময়লা পানি থেকে উঠাতে পারবে না। আমি যেটা বলি সেটা কিন্তু করি। আমি যেটা বলবো আমি সেটা করবো। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা,  জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেন, জলাবদ্ধতায় তাদের দু:খ দুর্দশার কথা শুনেন ও দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ শেষ হয়ে যাবে। আমার প্রত্যাশা আছে।  ডিএনডি প্রজেক্টের জন্য ১২শ ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মূলত করোনা ও রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এই টাকাটা আসতে দেরি হয়ে গেছে। তবে এই জুলাই মাসেই টাকাটা আসবে। যেহেতু সেনাবাহিনী কাজটি করবে আমার প্রত্যাশা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজটি তারা শেষ করতে পারবে। তাদের ওপর আমাদের আস্থা রয়েছে।
এদিকে, শামীম ওসমানের ময়লা পানিতে নামার ঘোষণার পর টনক নড়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকের। ডিএনডির অভ্যন্তরে জলাবদ্ধতার পানি দ্রুত নিষ্কাশন করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
চলতি বছরের ৪ জুলাই সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি নিষ্কাশনের পাম্প স্টেশন পরিদর্শনে আসেন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক রমজান আলী প্রামাণিক। সেখানে গিয়ে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জলাবদ্ধতার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে তাদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেন।
এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক জানান, কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও কোরবানির পশুর বর্জ্যের কারণে নিষ্কাশন খালে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ডিএনডি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও ডেমরার বেশ কিছু নিম্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। দুর্গত এলাকার মানুষের এ ভোগান্তি দূর করতে পানি নিষ্কাশন খালগুলোর বাঁধাসমূহ অপসারণ ও পানি প্রবাহ নিশ্চিত করে জমে থাকা পানি দ্রুত  নিষ্কাশন করার নির্দেশ দেন। এরপর কয়েক মাস চলে গেলেও সমস্যার স্থায়ী কোন সমাধান করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলবে কবে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজছে ভুক্তভোগী মহল।
নিউজটি শেয়ার করুন...

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Recent Comments

    © All rights reserved © 2023
    Design & Developed BY M Host BD